সর্বশেষ

বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের ৪৩ তম মৃত্যুবার্ষিকী ১০ ডিসেম্বর।। নোয়াখালীতে প্রতিষ্ঠার ছয় বছরেও পূর্ণতা পায়নি বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর

আবু নাছের মঞ্জু
বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের ৪৩ তম মৃত্যুবার্ষিকী ১০ ডিসেম্বর। একাত্তরের এইদিনে খুলনার রূপসা নদীতে যুদ্ধজাহাজ পলাশে শত্রুপক্ষের বিমান হামলায় শহীদ হন তিনি। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার রুহুল আমিন নগরে এই বীরের নামে প্রতিষ্ঠিত বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ছয় বছরেও পূর্ণতা পায়নি। এনিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও রুহুল আমিনের স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
২০০৮ সালে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো. রুহুল আমিনের বাড়ির পাশে পরিবারের দান করা ২০ শতক জমির স্থানীয় সরকার বিভাগের অর্থায়নে নোয়াখালী জেলা পরিষদ বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো. রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে। এখানে রয়েছে বিভিন্ন সময়ে তার পরিবারকে দেয়া সরকারি-বেসরকারি পদকের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধসহ নানা বিষয়ের বই, আছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নানা পোস্টার, সাময়িকী আর পত্রপত্রিকা। তবে, প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্তই কম বলে মনে করেন দর্শনার্থীরা। নোয়াখালী সরকারি কলেজের ছাত্র মেঞ্জামিন মো. রফি বলেন, ‘একজন বীরশ্রেষ্ঠের নামে স্মৃতি জাদুঘর এতো কম পরিসরে হতে পারে না। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি যাতে জাদুঘরটিকে আরো সম্প্রসারিত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আরো অনেক সরঞ্জাম এখানে আনা হয়, বই পুস্তকও আরো বাড়ানো হয়। তাহলে আমরা মুত্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আরো জানতে পারবো’।

এলাকাবাসী ও দর্শনার্র্থীদের দাবি এই কমপ্লেক্সকে ঘিরে সরকারিভাবে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নানা কর্মকান্ড পরিচালনার; যাতে করে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মো. হানিফ বলেন, ‘জাদুঘরটিতে অনেক কিছুর অভাব রয়েছে। এই বীরকে আগামী প্রজম্মের কাছে তুলে ধরতে হলে জাদুঘরটিকে আরো উন্নত করতে হবে। এখানে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সভা-সমাবেশ সহ বিভিন্ন উদ্বুদ্ধকরণ কর্মকা- করতে হবে।’

আর বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পরিবারের দাবি এ প্রতিষ্ঠানটিকে আরো আধুনিকায়নের পাশাপাশি সরকারিভাবে এখানে বীরশ্রেষ্ঠের জম্ম ও মৃত্যু বার্ষিকীসহ জাতীয় দিবসগুলো পালনের ব্যবস্থা করার। বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের নাতি সোহেল চৌধুরী (বড় মেয়ে নুরজাহানের ছেলে) বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি করার পর অত্র অলাকায় শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রসার ঘটেছে। এখানে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আরো বিভিন্ন রকম কার্যক্রম পরিচালনা করলে এলাকার ছাত্রছাত্রী এবং পরবর্তী প্রজম্ম মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আরো বেশি করে জানতে পারবে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নিজেদের গড়ে তুলতে পারবে।’ গ্রন্থাগারের জন্য একজন লাইব্রেরিয়ান ও স্মৃতি কমপ্লেক্সে যাতায়ানের সড়কটি মেরামতের দাবি জানান তিনি।

কমপ্লেক্সেটি তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা পরিষদও  প্রতিষ্ঠানটি ঠিকভাবে চলছে না বলে স্বীকার করেছে। নিজেদের অল্প পরিমাণ বাজেট দিয়ে এ ধরণের প্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব নয় বিধায় মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয় থেকে সহযোগীতার কথা বললেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ডা. এবিএম জাফর উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জেলা পরিষদে অল্প পরিমাণ যে বাজেট দেয়া হয়, এসবে আসলে সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয় থেকে এ ধরণের প্রতিষ্ঠানকে রক্ষনাবেক্ষণে অর্থায়ন করার জন্য আলাদা একটা ফান্ড থাকা দরকার।’

সংক্ষিপ্ত জীবনী: বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো: রুহুল আমিন ১৯৩৫ সালে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার শহীদ রুহুল আমিন নগরে (বাঘপাচড়া গ্রামে) জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতার নাম আজহার পাটোয়ারী, মাতা জুলেখা খাতুন। রুহুল আমিন বাঘপাচড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে আমিষাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ১৯৫৩ সালে জুনিয়র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নৌ-বাহিনীতে যোগদান করে আরব সাগরে অবস্থিত নানোরা দ্বীপে পিএনএস বাহাদুর-এ প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি পিএনএস কারসাজে যোগদান করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি পেশাগত প্রশিক্ষণ শেষ করেন এবং ১৯৬৫ সালে মেকানিশিয়ান কোর্সের জন্য নির্বাচিত হন। পিএনএস কারসাজে কোর্স সমাপ্ত করার পর রুহুল আমিন আর্টিফিসার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে চট্রগ্রাম পিএনএস বখতিয়ার নৌ-ঘাটিতে বদলি হয়ে যান। ১৯৭১ এর এপ্রিলে ঘাটি থেকে পালিয়ে যান। রুহুল আমিন ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত অতিক্রম করে ২ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে থেকে বিভিন্ন স্থলযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী গঠিত হলে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। ভারত সরকার বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে দু’টি গানবোট উপহার দেয়। গানবোটের নামকরণ করা হয় পদ্মা  ও পলাশ। রুহুল আমিন পলাশের প্রধান ইঞ্জিন রুমে আর্টিফিসার হিসাবে দায়িত্ব গ্রহন করেন।

যেভাবে শহীদ হলেন: ৬ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী যশোর সেনানিবাস দখলের পর পদ্মা, পলাশ এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর একটি গানবোট ‘পানভেল’ খুলনার মংলা বন্দরে পাকিস্তানি নৌ-ঘাটি পিএনএস তিতুমীর দখলের উদ্দ্যেশে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ১০ ডিসেম্বর দুপুর ১২টার দিকে গানবোটগুলো খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছে এলে অনেক উুঁচুতে তিনটি জঙ্গি বিমান উড়তে দেখা যায়। শত্র“র বিমান অনুধাবন করে পদ্মা ও পলাশ থেকে গুলি করার অনুমতি চাওয়া হয়। কিন্তু অভিযানের সর্বাধিনায়ক ক্যাপ্টেন মনেন্দ্র নাথ ভারতীয় বিমান মনে করে গুলিবর্ষন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। এর কিছুক্ষণ পর বিমানগুলো থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে নিচে নেমে আসে এবং আচমকা গুলিবর্ষণ শুরু করে। গোলা সরাসরি ‘পদ্মা‘র ইঞ্জিন রুমে আঘাত করে ইঞ্জিন বিধস্ত করে। হতাহত হন অনেক নাবিক। পদ্মা’র পরিনতিতে পলাশের অধিনায়ক লে. কমান্ডার রায় চৌধুরী নাবিকদের জাহাজ ত্যাগের নির্দেশ দেন। রুহুল আমিন এই আদেশে ক্ষিপ্ত হন। তিনি উপস্থিত সবাইকে যুদ্ধ বন্ধ না করার আহ্বান করেন। কামানের ক্রুদের বিমানের দিকে গুলি ছুঁড়তে বলে তিনি ইঞ্জিন রুমে ফিরে আসেন। কিন্তু অধিনায়কের আদেশ অমান্য করে বিমানগুলো চ্যালেঞ্জ করা হয়নি। বিমানগুলো উপর্যুপরি বোমাবর্ষণ করে পলাশের ইঞ্জিনরুম ধ্বংস করে দেয়। শহীদ হন রুহুল আমিন। রূপসা নদীর পাড়ে তাঁকে সমাহিত করা হয়।


  • আবু নাছের মঞ্জু

লোকসংবাদ | Loksangbad | The First Bangla Online Newspaper from Noakhali সাজসজ্জা করেছেন মুকুল | কপিরাইট © ২০১৫ | লোকসংবাদ | ব্লগার

Bim থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.