সর্বশেষ

বঞ্চনা থেকে স্বাধীনতা


সাইদ বিন সিদ্দিক 

বঞ্চনা থেকে স্বাধীনতা 


১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ পরবর্তী সময়ে ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বিপুল সংখ্যক লোকের প্রাণহানি সর্বোপরি ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ইংরেজ রাজত্বের অবসান এবং পাক-ভারত বিভাজন সুনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিম পাকিস্তান এ দুটি অংশ নিয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে আসাম ও বাংলা (পশ্চিম বঙ্গ ও পূর্ববঙ্গ) পূর্ব পকিস্তানের অন্তর্ভূক্তির আলোচনা থাকলেও বড় লাট লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন, জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় মুসলিমলীগ ও কংগ্রেসের কারসাজিতে পূর্ববঙ্গ ও আসামের সিলেট অংশ নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান গঠিত হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আকরাম, আবুল হাশিম সহ আরো অনেক নেতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকাও মনে রাখার মত।

পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্টিত হন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলিমলীগ সরকার। তিনি হন পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সংঙ্গে শিক্ষা, সাংস্কৃতি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করে। ক্ষমতাসীন হয়ে মুসলীমলীগ সরকার প্রথমেই পূর্ব পাকিস্তানের ৩০ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়ে শিক্ষার প্রাথমিক স্তরকে ধবংসের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটনের অপপ্রয়াস চালায়। আমরা জানি শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। আর শিক্ষার বাহন হচ্ছে ভাষা। আর মাতৃভাষার বিকাশ ছাড়া জাতির মেরুদণ্ড মজবুত হতে পারে না। তাই তারা মাতৃভাষা বাংলার উপর আঘাত হানে। পাকিস্তানের মোট জনগোষ্ঠীর ৫৬ ভাগ লোকের বাস পূর্ববঙ্গে। তাদের মাতৃভাষা বাংলা। আর পশ্চিম পাকিস্তানের মাত্র ৬ ভাগ লোকের ভাষা উর্দু। অথচ পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিয়ে পূর্ববঙ্গের অফিস আদালত ও শিক্ষার মাধ্যম উর্দু করার মাধ্যমে এ বাংলার জনগোষ্ঠীকে চাকুরীর অযোগ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে পশ্চাদপদ করার অপপ্রয়াসে লিপ্ত হয়। তাই মাতৃভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবী আদায় করতে গিয়ে প্রথম পর্যায় ১৯৪৮ সালের আন্দোলন এবং দ্বিতীয় পর্যায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সালাম, রফিক, শফিক, জব্বার ও বরকতকে জীবন দিতে হয়। আহত ও নির্যাতিত হন অনেকে। 


বাঙ্গালী জাতি ছাড়া পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষা রক্ষার দাবী আদায়ে আর কোন জাতিকে রক্ত দিতে হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরীতে পূর্ববঙ্গের ১৫% এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ৮৫% ভাগ, সেনাবাহিনীর চাকুরিতে পূর্ববঙ্গের মাত্র ৫% এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ৯৫% ভাগ নিয়োগ পেত। ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ৪টি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বরাদ্দকৃত মোট অর্থের ৭১.৪০ ভাগ পশ্চিম পাকিস্তানের এবং ২৮.৬০ ভাগ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য রাখা হয়। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের চেতনায় ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করলেও বিভিন্ন ওজুহাত সৃষ্টি করে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্টের প্রাদেশিক সরকার বাতিল করে দেয়। এগুলো হচেছ শিক্ষা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের কিঞ্চিৎ নমুনা মাত্র। এই বৈষম্যের প্রকৃত রূপ অতিভয়ংকর। 

১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬২ শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ৬৬ এর ৬ দফা আন্দোলন এবং ৬৯ এর গণঅভ্যুথানের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছাত্র, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপর হত্যা, নির্যাতন, নিপীড়ন চলে। বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করার কারনে ২৩ বছরের পাকিস্তানী শাসন শোষণকালীন সময়ে ১৩ বৎসর ৯ মাস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারে আটক রাখা হয়। সেখানে তাকে দুই দুইবার ফাঁসি দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। কারাগারের পাশে তাঁর জন্য কবর খোড়া হয়। কারাগারে ঈদের দিনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর একটি মন্তব্য উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন,  

“নিষ্ঠুর গণহত্যাকারীদের দয়ার ওপর নির্ভরশীল বন্দীর জন্য ঈদ এক নিষিদ্ধ স্বপ্নের মতো। তাই ঈদের দিনেও ওরা আমাকে সেল থেকে বের হতে দেয়নি।....আমি মোনাজাত করে আমার জনগণের মঙ্গল ও নিরাপত্তা দয়াময় আল্লাহতালার হাতে সমর্পণ করলাম। এটাই ছিল আমার ঈদ।....বহুদিন যাবৎ (তখন আট মাসের ওপর) আটক থেকে আমি সময়ের হিসেব হারিয়ে ফেলেছিলাম। নরক-সম সেলের বাইরে ইতোমধ্যে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়ে গেছে। এমনি অবস্থায় সেকেন্ডের এক ভগ্নাংশকেও মনে হতো জীবনের কিছুটা সম্প্রসারণ অথবা মৃত্যুর সাময়িক পশ্চাদপসরণ।”  

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলিম জাতির রাষ্ট্র হিসেবে সৃষ্ট পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী। পূর্ব পাকিস্তানের লোকদের শোষন বঞ্চনা করতে আর এর অবসান দাবী করলে তাদের হত্যা নির্যাতন, নিপীড়ন করাই যেন একমাত্র নীতি হয়ে দাঁড়ায়। এরমধ্যে ১৯৭০ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ গণপরিষদের ৩১৩ আসনের মাধ্যে ১৬৭ আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। গনতান্ত্রিক নিয়মে সরকার গঠনের অধিকার অর্জন করে। কিন্তু বিধি বাম। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর না করার কুট কৌশল গ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধুর চাপে ৩ মার্চ ১৯৭১ গণপরিষদের অধিবেশন ডাকা হলেও ১ মার্চ তারিখে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খাঁন তা স্থগিত ঘোষণা করেন। এমন পরিস্থিতিতে ৭ মার্চ তারিখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় দিক নির্দেশনামূলক ঐতিহাসিক বক্তব্য দেন। এ ভাষণে তিনি ঘোষণা দেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এ ঘোষণা স্বাধীনতার সিগনাল। এ গ্রিন সিগনাল পেয়েই বাঙালী জাতি স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্ততি নিয়ে সংগঠিত হতে থাকে।

এর পর ইয়াহিয়া খাঁন ও জুলফিকার আলী ভূট্টো আলোচনার নামে সময় ক্ষেপনের অন্তরালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সেনা মোতায়েন করে। ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে অপারেশন সার্চ লাইটের নামে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় হত্যাযঞ্জ চালায়। শুরু হয় যুদ্ধ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ২৫শে মার্চ রাতের দ্বিপ্রহরে অর্থাৎ ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ঐ রাতেই তাঁকে গ্রেফতার করে প্রথমে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ও পরে পাকিস্তানের কারাগারে আটক রাখা হয়। দীর্ঘ প্রায় ৯ মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তি যুদ্ধ চলে। এ যুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং এর সহযোগী এদেশীয় রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী এদেশের ৩০ লক্ষ লোককে হত্যা এবং ২ লক্ষ মা বোনের ইজ্জত লুন্ঠন করে। হত্যাকান্ডের সমাপ্তি ঘটায় বিজয়ের প্রাককালে ১৪ ডিসেম্বর ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার তথা বুদ্ধিজীবিদের নৃশংসভাবে হত্যার মাধ্যমে। বাঙালীদের বিজয় এবং পাক বাহিনীর পরাজয় যখন সুনিশ্চত হয়ে পড়ে তখন এদেশকে মেধাশূন্য করার লক্ষ্যে বুদ্ধিজীবি হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠে পাকসেনা ও তাদের দোষর রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী। এ হত্যাকান্ড এতই নিষ্ঠুর এবং পৈশাচিক ছিল যে চোখের ডাক্তারকে হত্যা পূর্বে তাঁর চোখ উপড়িয়ে ফেলা হয়েছে, হার্টের ডাক্তারকে তার বুক চিরে হৃৎপিন্ড বের করে নেওয়া হয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর তারিখে প্রায় ৩০০ জন বুদ্ধিজীবিকে এভাবে হত্যা করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে রাখে।

অনেক রক্ত আর নির্যাতনের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর পাক বাহিনীন আত্মসমর্পনের মধ্যে দিয়ে আমাদের বিজয় অর্জিত হয়। এ দেশের স্বাধীনতা, আমাদের স্বাধীনতা আসে। আমাদের পূর্বসূরীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতা আমরা আজ ভোগ করছি। সে বদৌলতেই চাকুরী থেকে রাজনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছি। তাই এর কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আমাদের উচিৎ স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনে ব্রতী হওয়া। 
----০----

লোকসংবাদ | Loksangbad | The First Bangla Online Newspaper from Noakhali সাজসজ্জা করেছেন মুকুল | কপিরাইট © ২০১৫ | লোকসংবাদ | ব্লগার

Bim থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.