সর্বশেষ

অহিংস নীতির প্রতিকৃতি গান্ধী আশ্রম ও গান্ধী স্মৃতি যাদুঘর



আবু নাছের মঞ্জু: 
২ অক্টোবর অহিংস নীতির অন্যতম পুরোধা মহাম্মা মোহনদাস করম চাঁদ গান্ধীর ১৪০ তম জম্ম দিন। ১৮৬৯ সালের এদিন ভারতের গুজরাট প্রদেশের পৌর বন্দরে তিনি জন্ম গ্রহণ করে। ২০০৭ সাল থেকে জাতিসংঘের ঘোষণার মধ্যদিয়ে দিনটি বিশ্বব্যাপী অহিংস দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। আমৃত্যু গান্ধী মানুষের মাঝে শান্তি ও অহিংসার বাণী প্রচার করতে দেশে দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি আততায়ির গুলিতে তাঁর দেহাবসান হয়। হিংসার বুলেটে গান্ধীর দেহাবসান হলেও তাঁর জীবনাদর্শ ও অহিংসার বাণী চীর অম্লান হয়ে আছে প্রজম্ম প্রজমান্তরে। দেশে দেশে নানা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান গান্ধীর শান্তি ও অহিংসার বাণীর ফেরি করে চলছে। নোয়াখালীর নিভৃত গাঁয়ের গান্ধী আশ্রম ট্রাষ্ট তেমনি একটি প্রতিষ্ঠান।
অহিংসা সর্বোত্তম গুন যা ভালবাসা হতে উৎসারিত হয়; কষ্টকে দূরে সরানোর একমাত্র পথ ভালবাসা; সত্য চিরকালই সত্য, এমনকি যদিওবা সেখানে কোন জনসমর্থন নাও থাকে। সাতটি সামাজিক পাপ হচ্ছে-নীতিহীন রাজনীতি, নৈতিকতাহীন বাণিজ্য, পরিশ্রমহীন সম্পদ, চরিত্রহীন শিক্ষা, মানবতাহীন বিজ্ঞান, বিবেকবর্জিত আনন্দ, ত্যাগহীন অর্চনা। কথাগুলো আজকের এ সুবিধাবাদের জামানায় কেউ বললে মানুষ তা কতটুকু শুনবে তা হয়তো প্রশ্ন স্বাপেক্ষ। অথচ গান্ধী আশ্রম ও গান্ধী স্মৃতি যাদুঘরে রক্ষিত গান্ধীজির বিভিন্ন বাণী, বইপত্র, তাঁর বর্ণঢ্য জীবনের বিভিন্ন সময়কে ধারণ করে রাখা ছবিগুলো এবং তাঁর ব্যবহার্য্য তৈজসপত্র যেন সে কথাই বলছে। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা, অহিংস নীতির প্রবর্তক মহাত্মা মোহন করমচাঁদ গান্ধী’র স্মৃতি বিজড়িত নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার জয়াগ গ্রামের গান্ধী আশ্রম ট্রস্টের বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম এবং গান্ধী স্মৃতি যাদুঘরে রক্ষিত গান্ধীজির কর্মময় জীবনের কিছু কথা, কিছু ছবি, কিছু স্মৃতি যেকারো চিন্তা জগতকে নাড়া দেবে। কোন ব্যক্তির স্মৃতি কিংবা ব্যক্তি জীবনের কর্মকান্ড নিয়ে এমন যাদুঘর সত্যিই বিরল।

গান্ধী স্মৃতি যাদুঘরে প্রবেশ করতেই মহাত্মা গান্ধীর বিশাল আবক্ষ মূর্তি যেকারো নজর কাঁড়বে। গান্ধীজির শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৩০টি ছবি শোভা পাচ্ছে যাদুঘরে। বৃটিশদের বিরুদ্ধে স্বদেশী আন্দোলনের সময় বিলেতি পোষক বর্জনের ডাক দিয়ে যে চরকায় গান্ধী সুতা কাটতেন যাদুঘরে সংরক্ষিত সে চরকা এখনও মানুষের জীবনবোধকে নাড়া দেয়। যাদুঘরে সংরক্ষিত ১৯২৪ সালে অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হবার পর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সাথে তোলা মহাত্মা গান্ধীর ছবিটি যেন এখনও মানুষকে শোষণ মুক্তির সংগ্রামের ডাক দেয়।

পেছনের কথা: ব্রিটিশ শাসনামলের শেষের দিকে অবিভক্ত ভারত বর্ষের বিভিন্ন স্থানে যখন হিন্দু মুসলিম সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা ভয়াবহ রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। তখন কলকাতার পর ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে পূর্ব বাংলার নোয়াখালীতেও এ সা¤প্রদায়িকতার বিষবাস্প ছড়িযে পড়ে। সে দুঃসময়ে মহাত্মা মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী শান্তি মিশন নিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে নোয়াখালীতে আসেন। ১৯৪৭ সালের ৭ নভেম্বর গান্ধীজি নোয়াখালীর প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র চৌমুহনীর রেলস্টেশনে পদার্পন করে রেলওয়ে ময়দানে প্রথম জনসভা করেন। এরপর বর্তমান লক্ষীপুর সদর উপজেলার দত্তপাড়া গ্রামে জনসভার মধ্যদিয়ে গান্ধীজি তাঁর গ্রাম পরিক্রমা শুরু করেন। প্রতিটি গ্রামে হেঁটে হেঁটে গান্ধীজি মানুষকে শান্তির অভয় বাণী শোনান। এমসয় তিনি সা¤প্রদায়িক দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য পুনর্বাসন কার্যক্রম, হিন্দু-মুসলিম সৌভ্রাতৃত্ব স্থাপন, অষ্পশ্যতা বর্জন, বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকাণ্ড শুরু করেন। গান্ধীজি তাঁর গ্রাম পরিক্রমার এক পর্যায়ে ১৯৪৭ সালের ২৯ জানুয়ারি জয়াগ গ্রামে আগমন করেন। ৩০ জানুয়ারি তিনি জয়াগে একটি বুনিয়াদী বিদ্যালয় উদ্বোাধন করেন। বিদ্যালয়টি বর্তমানে গান্ধী মেমোরিয়াল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট নামে পরিচিত। জয়াগ গ্রামের তৎকালীন জমিদার এবং নোয়াখালীর প্রথম ব্যারিষ্টার হেমন্ত কুমার ঘোষ জয়াগে গান্ধীর আগমন ও তাঁর বাড়িতে অবস্থানের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে নিজ জমিদারীর সমস্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি পিতা অন্বিকাচরণ ঘোষ এবং মাতা কালীগঙ্গা চৌধুরানীর নামানুসারে ১৯৪৯ সালে অন্বিকাকালীগঙ্গা দাতব্য ট্রাস্ট্র গঠনের মাধ্যমে জাতী-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য গান্ধীজিকে দান করেন। আর এভাবেই শান্তিমিশনে কর্মরত গান্ধী কর্মীদের একটি স্থায়ী আবাসনের সৃস্টি হলো। যার প্রচলিত নাম ছিল গান্ধী ক্যাম্প। ১৯৪৬ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৯৪৭ সালের ১৭ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালী অবস্থানের পর ১৭ ফেব্র“য়ারি চাঁদপুর জেলায় প্রবেশ করেন। এ শান্তি পরিক্রমাকালে বিহারে সা¤প্রদায়িক দাঙ্গার খবর পেয়ে গান্ধীজি দাঙ্গা নিবারনের উদ্দেশ্যে সেখানে যাওয়ার জন্য বিচলিত হয়ে পড়েন। ২ মার্চ তিনি মৃদুলা সারাভাই, মানু গান্ধী ও চারু চৌধুরীকে সাথে নিয়ে বিহারের উদ্দেশ্যে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওয়না হন। কলকাতার হাওড়া স্টেশনে চারু চৌধুরী বিদায় চাইলে গান্ধীজি তাঁকে বলেন- ”নোয়াখালীতে গিয়ে শান্তি মিশনে কাজ করতে থাক, আমিতো আবার আসবো।” গুরুর শেষ নির্দেশ মাথায় নিয়ে চারু চৌধুরী নোয়াখালী ফিরে আসেন। গান্ধীর এ নির্দেশকে অনুসরন করে চারু চৌধুরীর সাথে নোয়াখালীতে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন দেবেন্দ্র নারায়ণ সরকার, মদনমোহন চট্রোপাধ্যায়, সাধনেন্দ্র নাথ মিত্র, বিশ্বরঞ্জ সেন, রঞ্জন কুমার দত্ত, অজিত কুমার দে, জীবন কুমার দে, ও রেড্ডি পল্লী সত্যনারায়ন। এদের কেউই এখন আর জীবিত নেই।
১৯৪৭ ১৪ ১৫ আগষ্ট ভারত বিভক্তির সাথে সাথে গান্ধী কর্মীদের উপর অমানুষিক নির্যাতন নেমে আসে। পাকিস্থান সরকারও এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। ১৯৫০ সালে নোয়াখালীর বনেদী হিন্দুরা দেশ ত্যাগ করলো। সেসময় বাংলার গান্ধী প্রতিষ্ঠানের মহা-পরিচালক সতীশ দাশগুপ্তসহ অধিকাংশ গান্ধী কর্মী ভারত চলে গেলেন। ষাটের দশকে গান্ধী কর্মীদের উপর নির্যানের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। এ প্রতিষ্ঠানের সমস্ত সম্পত্তিকে শত্র“ সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং অধিকাংশ কর্মীকে রাখা হয় কারাগারে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনী ও রাজাকাররা গান্ধীজির ঘনিষ্ঠ সহযোগী মদন মোহন চট্রোপাধ্যায়, দেবেন্দ্র নারায়ন সরকার, অজিত কুমার দে ও জীবন কৃষ্ণ সাহাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। গান্ধীজির শান্তি মিশনের অন্যতম সদস্য চারু চৌধুরী বিভিন্ন সময় গ্রেফতার এবং কারাভোগ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর কারামুক্ত হন। ১৯৭৫ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বিশেষ বলে অন্বিকাকালীগঙ্গা দাতব্য ট্রাস্ট্র পুর্নগঠন কওে গান্ধী আশ্রম বোর্ড অব ট্রাষ্ট গঠন কওে এ প্রতিষ্ঠানের আইনানুগ স্বকিৃতি দেন। এ ট্রাষ্টি বোর্ডে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। সেই থেকে শুরু হয় ট্রাষ্টের সেবামুলক কর্মকান্ড। গান্ধী আশ্রম ট্রাষ্টের মিশন হলো পিছিয়ে পড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে তাদের স্বালম্বী করে তোলা, যাতে তারা বাইরের কোন সাহায্য ছাড়াই চলতে পারে, নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণ করার সামর্থ অর্জন করতে পারে এবং দুঃখ দুর্দশায় যেকোন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে। সর্বোপরি শান্তি ও ঐক্য সুসহত রাখতে সমর্থ হয়। ট্রাষ্টের প্রকল্প কর্মকর্তা রাহা নব কুমার জানন, দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে গান্ধী আশ্রম ট্রাষ্ট উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলছে। বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার পরিবারের দেড় লাখ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ট্রাষ্ট বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করছে।
মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতি বিজড়িত বিভিন্ন ছিবি, বইপত্র ও জিনিষপত্র নিয়ে ২০০০ সালে গান্ধী আশ্রমের মূল ভবনকে রূপ দেয়া হয় গান্ধী স্মৃতি যাদুঘরে। এ বছরের ১২ অক্টোবর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহম্মেদ আনুষ্ঠানিকভাবে যাদুঘরের দ্বার উন্মোচন করেন। এ যাদুঘর বাংলাদেশে গান্ধীর স্মৃতি ধরে রাখার পাশাপাশি প্রজম্ম প্রজমান্তরে প্রচার করছে তাঁর অহিংস ও মানব প্রেমের বাণী ।

যেভাবে যেতে হবে: গান্ধী আশ্রম ও  গান্ধী স্মৃতি যাদুঘরে যেতে হলে  নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌরাস্তা থেকে বাসে জয়াগ বাজার নামতে হবে। কিংবা সোনাইমুড়ী থেকে বাসে নামতে হবে জয়াগ বাজারে। দর্শণার্থীদের জন্য রবিবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০ টা থেকে দুপুর ১ টা এবং দুপুর ২ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত যাদুঘর খোলা থাকে। দর্শণার্থীদের সুবিধার জন্য ট্রাষ্টের পক্ষ থেকে গাইড দেয়া হয়।

লোকসংবাদ | Loksangbad | The First Bangla Online Newspaper from Noakhali সাজসজ্জা করেছেন মুকুল | কপিরাইট © ২০১৫ | লোকসংবাদ | ব্লগার

Bim থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.